যদি বলি সিলেট থেকে বাংলা সাহিত্যের অনেক কিছুই আমরা পেয়েছি তবে তা হয়তো একপেশে শোনাবে। তবে সংকীর্ণতার পরিচয় দিতে নয়, বরং মহান বাঙালি জাতিকে সাহিত্য বাস্তবতা একটু স্মরণ করিয়ে দিতে এই প্রবন্ধ রচনা। সিলেট প্রীতি কিংবা সাম্প্রদায়িক উপস্থাপনা নয়, সত্যিটা হলো ইতিহাস বলার জন্য এই লেখা।
আমরা জানি বল্লাল সেন মহান ভারতীয় জাতিকে ৪ শ্রেণিতে বিভক্ত করে হিন্দুত্বের শ্রেণি বিন্যাস করেন এবং বৌদ্ধ সম্প্রদায়কে হিন্দু জাতি থেকে বাইরে বের করে দেন। জানা যায় তিনি মুন্সিগঞ্জ এবং পশ্চিম ময়মনসিংহ অঞ্চলে তাঁর রাজ্য সম্প্রসার করেন। সিডিউল কাস্ট বা অন্তজ শ্রেণিকে হিন্দু সম্প্রদায় থেকে তিনি বের করে দেন।
ব্রাহ্মণ সম্পদায় তখন তাঁর ইঙ্গিতে নিম্নবর্গের হিন্দুদের উপর চালায় ধর্মীয় নিপীড়ন। একই সঙ্গে বৌদ্ধদের উপরও তিনি নিপীড়ম চালান। বৌদ্ধরা তখন দেশ ছেড়ে পালাতে থাকে। অমানুষিক নির্যাতনে তাঁদের মধ্যে ধর্মত্যাগও যুক্ত হয়। তারা ধর্ম ও জাতি রক্ষার জন্য তাঁদের বিহারগুলোকে সেনানিবাসের মতো করে গড়ে তোলে। অপরদিকে নিম্ন বর্ণের হিন্দুরা তখন দাসত্বের শিকলে বাধা পড়ে। বৌদ্ধদের উপর রাষ্ট্রীয় নির্যাতন বেড়ে গেলে তারা স্থান ত্যাগ করতে থাকে এবং তিব্বত পর্যন্ত গিয়ে আত্মগোপন করে। তিব্বতি ভাষায় এ কারণেই চর্যাপদ পাওয়া যায়। সিলেটের ভাটেরায় প্রাপ্ত শিলালিপিতে তখন যে চন্দ্রপুর রাজ্যের কথা পাওয়া যায় তার সীমানা দক্ষিণ পশ্চিমে হবিগঞ্জ এবং উত্তরে কুশিয়ার নদী এবং ত্রিপুরার ধর্মনগরের ইঙ্গিত মিলে।বর্তমান সাগরনালে তার রাজধানী থাকারও ইঙ্গিত রয়েছে। এ রাজ্যটি ছিল বৌদ্ধরাষ্ট্র। বাংলাদেশের উত্তরাংশ,ঢাকার মুন্সিগঞ্জ,নরসিংদী ও কুমিল্লার ময়নামতিতে বিহার [রক্ষা ব্যূহ] ছেড়ে তারা পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং সিলেটের পাথারিয়া ও আসামের পাহাড়ে গিয়ে বসবাস শুরু করে। চর্যাপদে উল্লখিত ‘বউ রাতে হয় কামাতুর আর দিনে হয় কাকভীত’- এ পয়ার পাহাড়কেই জ্যান্ত করে।
আক্রান্ত হয়ে বৌদ্ধরা এবং অখণ্ড সিলেটের সাগরনালের চন্দ্রপুর রাজ্য, পাথারিয়া পর্বত প্রভৃতি ছেড়ে করিমগঞ্জ,কাছাড়,শিলচর ও আসাম পর্যন্ত যেতে যেতে চর্যাপদ বড় করতে থাকে। তাদের সাধন ভজন পদ্ধতিকে লিপিবদ্ধ করে রাখার প্রয়াস থেকে লেখা হতে থাকা চর্যাচর্যগীতিকা যা পরবর্তী সময়ে নেপালের রাজ দরবার থেকে আবিষ্কৃত হয় এবং চর্যাপদ নামে পরিচিতি পায়। সিলেট ও আসামে বসে চর্যাপদ রচিত হয় বলে চর্যাপদে সিলেটের ভাষা ও মাটি-মানুষের বর্ণনা পাওয়া যায়। উপরোক্ত দাবি বাংলা একাডেমি পুরষ্কারপ্রাপ্ত গবেষক মুহাম্মদ আসাদ্দর আলীর।
বাংলাসাহিত্যের সূতিকাগার সিলেট ও আসাম।
প্রাণ বিপন্ন ভেবে একসময় বৌদ্ধরা সিলেট ও আসাম অঞ্চল ছেড়ে নেপাল ও তিব্বতে গিয়েছিলো। আগেই বলেছি তিব্বতি ভাষায়ও চর্যাপদ পাওয়া গেছে।
চর্যাপদ ও বৈষ্ণব সাহিত্য
বাংলাসাহিত্যের প্রথম গ্রন্থ চর্যাপদ। সন্ধ্যা ভাষায় চর্যাপদ রচিত হয়। এ ছাড়াও বৈষ্ণব সাহিত্যের রক্তধারাও সিলেটের। চর্যাপদ যেমন বাংলাসাহিত্যের পাইলিং তেমনি বৈষ্ণবসাহিত্যকে বাংলাসাহিত্যের ছাদ গণ্য করা হয়ে থাকে।
নবদ্বীপে জন্ম হলেও শ্রী চৈতন্যদেবের পৈত্রিক বাড়ি সিলেটের গোলাপগঞ্জের ঢাকাদক্ষিণ। তাঁর বাবা জগন্নাথ মিশ্র। বাঙালির হাতে এবং বাংলায় উদ্ভাবিত একমাত্র ধর্ম হলো বৈষ্ণব ধর্ম। এ ধর্মের অপভ্রংশ নাথ ধর্ম। শ্রী চৈতন্য দেবকে ডেকে নিয়ে জগন্নাথ দেবের মন্দিরে হত্যা করে উড়িষ্যা উপকুলে বঙ্গোপসাগরে লাশ ফেলে দেওয়া হয়। বৈষ্ণবসাহিত্য ও নাথসাহিত্য শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কৃষ্ণ ভক্তি থেকেই রচিত হয়েছে।
ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি নবদ্বীপ আক্রমন করে নিম্নবর্গের লোকের হাতে রাজদণ্ড তুলে দিলে নিম্ন বর্ণের হিন্দুরা মুসলমান হতে থাকে। কৃষ্ণ ভক্ত হিসাবে চৈতন্যদেব মুসলিম সাম্যধারার সুফীবাদের অনুকরণে সাম্যবাদী বৈষ্ণব ধর্মের তখনই প্রবর্তন করেন। তাতে নিম্ন বর্ণের হিন্দুদেরকে মুসলমান হওয়া থেকে বিরত রাখা সম্ভব হয়। আবার মুসলমারা পরবর্তীকালে বৈষ্ণব ধারার আদলে স্থানীয়ভাবে বাউল মতবাদের জন্ম দেন।
শ্রী চৈতন্যদেবকে কেন্দ্র করে বৈষ্ণবসাহিত্য প্রচারিত হওয়াতে এখানেও পরবর্তী সময়ের বাংলা সাহিত্যে সিলেটের রক্তপ্রবাহিত হওয়া নিশ্চিত হয়।
ভারতীয় ভাববাদ বাঙালি মানসই শুধু নয়,বিশ্ব মানসেও জল সিঞ্চন করেছে রবীন্দ্র সাহিত্যের আলোকধারায়।আর রবীন্দ্রনাথ বড় চমক পশ্চিমা বিশ্বকে দিয়েছিলেন হাছন রাজার একটি বাক্যে। ‘মম আঁখি হইতে পয়দা আছমান জমিন’ এর ব্যাখ্যায় শান্তির সন্ধান দিয়ে। এখনো হাছন রাজার গানে পশ্চিমা বিশ্ব শান্তি খোঁজে পায়।
যে মরমি দর্শনের চর্চায় আজো বিশ্ব শান্তি খোঁজে সে মরমি গানের উৎসমুখ মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার গোলাম হুসনের গানের পাণ্ডুলিপি।যার রচনাকাল ১৭৭৪ খ্রিষ্টাব্দ। এবছরই লালন সাঁইয়ের জন্ম। যা লন্ডন থেকে আবিষ্কৃত হয়ে আন্তর্জতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট থেকে সিলেটি নাগরীবিদ মোস্তফা সেলিমের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে। তারই উত্তরাধিকার মরমী সাধক হাছন রাজা সিলেট সন্তান।
ব্রতচারী আন্দোলন
ব্রতচারী আন্দোলন ষোলআনা খাটি বাঙালি হওয়ার একটি আন্দোলন। বাংলায় (ব্যাডেন পাওয়েলের স্কাউটিং আন্দোলনের মত) এক সময় ব্রতচারী আন্দোলন জনপ্রিয় ছিল। এ আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমান নবম শ্রেণিতে পড়াকালীন সিদ্ধহস্ত ছিলেন বলে তিনি দাবী করেছেন। ‘ব্রতচারী আন্দোলন’ -এর তিন দফাকে বাংলাদেশের সূতিকাগার বলা হয়। তিন দফা হচ্ছে:
ক,আমি বাঙালি।
খ,আমি বাংলাকে ভালোবাসী, এবং
গ,আমি বাংলার সেবা করবো।
১৯৩২ সালে সিলেটের জকিগঞ্জেরম মনিষী গুরুসদয় দত্ত এই আন্দোলন শুরু করেন। আগে তিনি ছিলেন লোকসাহিত্যের সংগ্রাহক ও গবেষক। পরে আইএসপি হয়ে অবিভক্ত বাংলায় এই আন্দোলন শুরু করেন। ব্রতচারী আন্দোলন ছিলো দেশপ্রেমের পীঠস্থান। নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুও এই আন্দোলনের প্রেরণা দানকারী বলে বর্ষীয়ান্দের কাছ থেকে জানা যায়। আমার দাদা লোক-সাহিত্যিক ও ভাষা সংগ্রামী আমির সাধুর নিকট থেকে আমি এ বিষয়ে প্রথম জেনেছি। গ্রামে বসবাসকারী একদম স্বল্প শিক্ষিত এই মরমি সাধক আমির সাধু ব্রতচারী আন্দোলনকে জানতেন! এটা কম বিস্ময়ের নয়।
বাংলা মরমী সংগীত
বাংলা মরমী সংগীতের প্রথম পর্ব সন্ধ্যা ভাষার চর্যাপদ এবং দ্বিতীয় পর্ব ছিল আদি বাংলা ভাষার বৈঞ্চব সাহিত্য। তৃতীয় পর্বে সিলেটি উপভাষায় নাগরীলপিতে কুলাউড়ার গোলাম হুসন তাঁর তালিব হুসন পান্ডুলিপি রচনা করেন। এ পর্বে বাংলা মরমি সাহিত্য মুসলমানদের লেখায় উঠে আসে। মুসলিম ভাবধারায় এটা প্রথম মরমি সাহিত্য।
এদিকে হাছন রাজা নিজেও তার গানে বাঙালির মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছেন এভাবে-‘হাছন রাজা বাঙালি গো / তোমার প্রেমের কাঙালি গো…। এভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূতিকাগারও এই সিলেট।
অনুবাদ সাহিত্য
বাংলা ভাষায় মহাভারতের প্রথম অনুবাদক সিলেটের সঞ্জয় গোর।
মধ্যযুগের পুঁথিসাহিত্য
মধ্যযুগের পুঁথি সাহিত্যের আলাওল, সৈয়দ সুলতান প্রমুখরা সিলেটের বলে জানা গেছে।
বাংলা রম্যসাহিত্য
বাংলা রম্যসাহিত্যের প্রধান লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী সিলেটের মৌলভীবাজারের সন্তান। একই ভাবে মুসলিম দর্শন শাস্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ সিলেটের সুনামগঞ্জের সন্তান।
লোকসাহিত্য
লোকসাহিত্যের প্রধান তিন গবেষকদের দুই জনের জন্ম মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জে। একজন আশরাফ হোসেন সাহিত্যরত্ন ও অপরজন গোলাম আকবর সাহিত্যভূষণ। গুরুসদয় দত্তের কথা আগেই উল্লখ করেছি। আমির সাধুর জন্মস্থান জুড়ীতে। বাউলসম্রাট আব্দুল করিমের বাড়ি সুনামগঞ্জে। এছাড়াও লোক গবেষকদের মধ্য মুহাম্মদ আসাদ্দর আলী, মোস্তফা সেলিম, সুমনকুমার দাশ এবং ইতিহাস চর্চাকারীদের মধ্যে মুমিনুল হক, রব্বানী চৌধুরী এবং বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল বেশ স্ব সক্রিয়। সম্প্রতি গবেষক ও অভিধান প্রণেতা হিসেবে মোশতাক চৌধুরীর নাম বাংলাসাহিত্যে যুক্ত হয়েছে।
আধুনিক কবিতা
কবি দিলওয়ার এবং মোফাজ্জল করিম সিলেটিদের মধ্যে আধুনিক কবি হিসেবে অগ্রগন্য।
মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি
মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি এমএজি সিলেটের সুনামগঞ্জের বীর সন্তান।
বিজ্ঞান কবিতা আন্দোলন
বিজ্ঞান যুগে বিজ্ঞান কবিতা এখন বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। ইতিহাস চর্চার জন্য বলতে হয়: কবিতার উপমা,উৎপ্রেক্ষা ও চিত্রকল্পে বিজ্ঞান চর্চার করছেন বিজ্ঞান কবি, সাংবাদিক ও বিজ্ঞান তাপস হাসনাইন সাজ্জাদী। তিনি বিজ্ঞান কবিতা আন্দোলনের সূচনা করেন ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে। ‘বিজ্ঞান কাব্যতত্ত্ব’, ‘বিজ্ঞান শিল্পতত্ত্ব’ এবং সমিতিভিত্তিক অধিক সাম্যের রাষ্ট্র দর্শন ‘অর্থনৈতিক বিজ্ঞানবাদ’ ও তাঁর উপস্থাপনা।’বিজ্ঞানবাদের কাব্যতত্ত্ব’ ও ‘বিজ্ঞান কবিতার রূপরেখা’ আলোচ্য পুস্তিকা আকারে তিনি প্রথম উপস্থাপন করেন। ঐতিহাসিক গ্রন্থ বিজ্ঞানকাব্যতত্ত্ব ও সাবলীল ছন্দ’ তাঁর লেখা। বিশ্বসাহিত্য ও রাষ্ট্র দর্শনে তাঁর গবেষণাপত্র এখন আলোচিত বিষয়। তিনি সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার জুড়ীর সন্তান। এটা সিলেটি রক্ত। সিলেটের রক্ত বাংলা সাহিত্যেকে বারবার জলসিঞ্চন করেছে।
বিশ্ব কবিতার বাঁকবদলে হাসনাইন সাজ্জাদীর বিজ্ঞানকাব্যতত্ত্ব আলোচিত বিষয়। বাংলা সাহিত্যের অনেক কিছুই এভাবে সিলেট সন্তানের হাতেই উপস্থাপিত হয়েছে।
আমরা সিলেটের নিজস্ব উপভাষা ও নিজস্ব বর্ণমালার কথা বলেছি। ‘সিলেটি নাগরিলিপি’ বাংলাসাহিত্যে এখন আলোচিত বিষয়। ঐতিহ্য হিসাবে সিলেট নাগরির চর্চাই শুধু নয়, গবেষক মোস্তফা সেলিম সিলেট নাগরীলিপির পুনর্জাগরণ সম্পন্ন করেছেন।
উপরোক্ত কারণসমূহে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ,বিকাশে এবং বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সিলেটিদের মুখ্য ভূমিকা ছিল। এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।
ঢাকা- তারিখ-১৯/০৩/২০২৬।