— সামিয়া সাজ্জাদী
মৌলভীবাজার জেলার জুড়ী উপজেলা শুধু ভৌগোলিক সৌন্দর্যের কারণে নয়, তার শিল্প–সাহিত্য–সংস্কৃতিমণ্ডিত ঐতিহ্যের কারণেও বিশেষভাবে পরিচিত। পাহাড়, নদী, চা–বাগান, গাছ ও বাঁশ মহালে সমৃদ্ধ সবুজের ভাঁজে গড়ে ওঠা এই অঞ্চল। বহু শতাব্দী ধরে মানুষের মনন, অনুভূতি, সৃজনশীলতা ও আধ্যাত্মিক তপস্যার কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়েছে। সাগরনালে রয়েছে চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসাবশেষ। কচুরগুলে জন্ম নিয়েছেন সিলেটি নাগরী সাহিত্যিক মুনশী আসিদ আলী। এভাবে গোবিন্দপুরে লোকসাহিত্যিক আমির সাধু, বিজ্ঞান কবিতার প্রবর্তক হাসনাইন সাজ্জাদী ( আবদুল হক সাজ্জাদী) , আইনজীবী ও আইন গ্রন্থ প্রণেতা আনোয়ারুল ইসলাম, জায়ফরনগরে কথাসাহিত্যিক ও আইনজীবী শওকতুল ইসলাম চৌধুরী, জায়ফর নগরে ভাটকবি আমরুজ আলী প্রমুখ। হরিবংশ খ্যাত মরমী সাধক দীন ভবানন্দ জুড়ী নদীর ঢেউয়ে গান বাধতেন এবং গাইতেন।
তাই একে “শিল্প–সাহিত্য–সংস্কৃতির আলোকোজ্জ্বল ভূমি” বলা হলে তা অত্যুক্তি নয়; বরং এই জনপদের আত্মপরিচয়ই এতে প্রতিফলিত হয়।
১. সাহিত্য ও মরমি চর্চার উর্বর ক্ষেত্র
জুড়ী অঞ্চলে লোকসাহিত্য, মরমি গান, বাউলধারা, পীর–দরবেশদের আধ্যাত্মিক কবিতা—সব মিলিয়ে এক সমৃদ্ধ সাহিত্যিক মাটি তৈরি হয়েছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গ্রামীণ রাগ ও ভাবসংগীত এখানকার সংস্কৃতিকে উজ্জ্বল করেছে। স্থানীয় কবি–গুণিজনরা সমাজচেতনা, মানবধর্ম, প্রেম–বিরহ এবং লোক–ঐতিহ্যকে সাহিত্যিক রূপ দিয়েছেন। তাঁদের কয়েকজনের নাম আগেই উল্লেখ করেছি। পরবর্তী সময়ে বিস্তারিত উপস্থাপন করা হবে।
২. শিল্পকলার স্বাভাবিক বিকাশ
জুড়ী উপকূলবর্তী নয়, তবুও প্রকৃতি এখানে শিল্পসত্ত্বাকে জাগিয়ে তোলে। চা–শ্রমিকদের জীবন, পাহাড়ি পথ, নদী ও বনাঞ্চলের দৃশ্য স্থানীয় চিত্রশিল্পী ও কারুশিল্পীদের কাজে প্রতিফলিত হয়েছে। বাঁশ–বেত শিল্প, নকশিকাঁথা, হস্তশিল্প, মৃৎশিল্প—সবই এখানকার দৈনন্দিন জীবন ও উৎসব–অনুষ্ঠানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ভবিষ্যতে এগুলো নিয়েও বিস্তারিত আলোকপাত করা হবে।
৩. সাংস্কৃতিক সাম্যের অনন্য আবহ
জুড়ী বহু জাতিগোষ্ঠীর মিলনভূমি। বাঙ্গালি, ক্ষুদ্র নৃ–গোষ্ঠী ও চা–শ্রমিক সম্প্রদায়ের সবচেয়ে সুন্দর বৈশিষ্ট্য হলো—তাদের পারস্পরিক সহাবস্থান। বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবে যে অংশগ্রহণ দেখা যায়, তা সাংস্কৃতিক সৌহার্দ্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বৈশাখী উৎসব, নতুন ধান কাটার উৎসব, গ্রামীণ পিঠা–পুলির মেলা, পালাগান—সব মিলিয়ে জুড়ীতে এক উচ্ছ্বাসময় সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এখানকার হাসনাইন সাজ্জাদী যেমন জাতীয় পর্যায়ের একজন গীতিকার, কবি ও সাংবাদিক তেমনি সিরাজুল ইসলাম তোলা গীতিকার ও সংগীত শিল্পী হিসেবে শিল্পকলা পুরস্কারপ্রাপ্ত।
৪. শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র
উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যাচর্চা ও জ্ঞান–সংস্কৃতির প্রসার ঘটেছে। নানা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাহিত্যসভা, পাঠাগার এবং সাংস্কৃতিক সংগঠন নিয়মিত সাহিত্য পাঠ, আলোচনা, নাট্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করে—যা স্থানীয় প্রতিভা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
৫. ঐতিহাসিক ও সামাজিক স্মৃতি
জুড়ী মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, সমাজ–সংস্কৃতির সংগ্রামী অধ্যায় এবং মানুষের জীবন–সংগ্রামকে ধারণ করে আছে। স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা, সমাজসংস্কারক ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা এই অঞ্চলের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছেন। তাদের স্মৃতি, সংগ্রাম ও অবদান জুড়ীর সাংস্কৃতিক পরিচয়কে সমৃদ্ধ করেছে। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মো. তইমুছ আলী, আবদুল খালিক চৌধুরী, সিরাজুল ইসলাম ও ছাত্র সংগঠকদের মধ্যে মোহাইমিন সালেহ অন্যতম। বীরমুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে এম এ জলিল মাসুক, এম এ মুমীত আসুক, আবদুল বসির, বাবুল বাঙালি, কামরুজ্জামান, মর্তুজা আলী, ছাবিদ আলী, আব্দুস সাত্তার, মন্টু দাস, আবদুল মতিন ওরফে মতিউর রহমান প্রমুখ সম্মুখ সমরের সৈনিক।
৬. সাংবাদিকতা
সাংবাদিকতায়ও জুড়ী অনেক সমৃদ্ধ। জাতীয় পরযাযে হাসনাইন সাজ্জাদী, আনোয়ারুল ইসলাম ও ওয়েস আহমেদের নাম সর্বাগ্রে উল্লেখ করতে হয়। স্থানীয় পর্যায়ে এখন অনেক গুণী সাংবাদিকদের নাম এখন আলোকোজ্জ্বল। এটা প্রারম্ভিক প্রবন্ধ। বিস্তারিত আসলে শিগগির।
সারসংক্ষেপ
যে ভূখণ্ডে প্রকৃতির সৌন্দর্য, মানুষের মানবিকতা, সাহিত্য–সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিক ধারা ও শিল্পসৃজন এক সুতোয় গাঁথা—সেই ভূমিকে স্বভাবতই আলোকোজ্জ্বল বলা যায়। মৌলভীবাজার জেলার জুড়ী উপজেলা ঠিক তেমনই—একটি প্রাণময়, সৃষ্টিশীল ও ইতিহাস–ঐতিহ্যপূর্ণ এক জনপদ।